সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা যতটা সংযুক্ত, বাস্তবে কি ততটাই কাছাকাছি?
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা যায়। খবর জানতে, নতুন কিছু শিখতে কিংবা নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অসাধারণ একটি মাধ্যম।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংযোগ কি আমাদের সত্যিকারের কাছাকাছি এনেছে?
আজ আমরা প্রতিদিন শত শত মানুষের পোস্ট দেখি, তাদের জীবনের আপডেট জানি, ছবি দেখি, মতামত পড়ি। অথচ অনেকেই জানি না পাশের ঘরের মানুষটি কেমন আছে। প্রতিবেশীর অসুস্থতার খবর জানার আগেই আমরা হয়তো কোনো ভাইরাল ভিডিও দেখে ফেলি।
একসময় সন্ধ্যা মানেই ছিল পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করা। এখন একই ঘরে বসেও অনেক পরিবার একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে নিজ নিজ মোবাইলের পর্দায় ব্যস্ত থাকে। নীরবতা যেন নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো দেখি। এতে অনেকেই নিজের জীবনকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। "ওর সবকিছু আছে, আমার নেই"—এমন ভাবনা থেকে হতাশা, হীনমন্যতা এমনকি মানসিক চাপও তৈরি হতে পারে। অথচ পর্দার আড়ালের সংগ্রামগুলো খুব কম মানুষই প্রকাশ করেন।
আবার, মতের অমিল হলেই আমরা খুব সহজে অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করি। এমন মন্তব্য লিখে ফেলি, যা হয়তো সামনাসামনি কখনোই বলতাম না। মনে রাখা দরকার, পর্দার ওপাশেও একজন মানুষ আছেন—তারও অনুভূতি আছে।
এর অর্থ এই নয় যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খারাপ। বরং এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি দিয়ে মানুষকে সচেতন করা যায়, জ্ঞান ভাগাভাগি করা যায়, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়, এমনকি রক্তদাতা বা হারিয়ে যাওয়া মানুষকেও খুঁজে পাওয়া যায়। প্রশ্নটি মাধ্যম নিয়ে নয়, বরং আমরা সেটি কীভাবে ব্যবহার করছি।
হয়তো আজ থেকেই আমরা কিছু ছোট পরিবর্তন আনতে পারি। পরিবারের সঙ্গে খাওয়ার সময় ফোন দূরে রাখা, প্রতিদিন অন্তত একজন প্রিয় মানুষের খোঁজ নেওয়া, কোনো খবর শেয়ার করার আগে সত্যতা যাচাই করা এবং মতের ভিন্নতা থাকলেও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা—এসব ছোট অভ্যাস আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে আরও সুন্দর করতে পারে।
প্রযুক্তি আমাদের হাতে একটি শক্তিশালী মাধ্যম তুলে দিয়েছে। এখন দায়িত্ব আমাদের—এই মাধ্যম মানুষকে কাছাকাছি আনতে ব্যবহার করব, নাকি দূরত্ব আরও বাড়াতে ব্যবহার করব।





